ভুল করলে পথের ফকির হতে পারেন - ডায়মন্ডে বিনিয়োগ কেমন হবে ?
আমাদের মত অর্থনীতির দেশের জনগণ সাধারণত ব্যাংকে টাকা জমা রাখে । কিন্তু ব্যাংকিং সিস্টেম যদি দুর্বল হয় তখন বিকল্প মাধ্যম খুঁজে বের করা সবচেয়ে সেরা উপায় ।
বিকল্প উপায় হিসাবে সোনা ছাড়া অন্য কোন ধাতুর গ্রহণযোগ্যতা সর্ব মহলে নেই ।
আপনি ভাবতে পারেন, হীরা তো সোনার চেয়েও দামী তাহলে হীরা কিনবো না কেন ?
হীরা প্রকৃতিতে বেশী পাওয়া যায় । কারণ হীরা হল বিরল কার্বনের স্ফটিক, আর কার্বন প্রচুর পাওয়া যায় । হীরা প্রকৃতিতে এতো থাকার পরেও দাম বেশী কেন ? কারণ বাজারে একে দুর্লভ বানিয়ে রাখা হয়েছে । "ডি বিয়ারস" নামের এক কোম্পানিই মূলত নাটের গুরু । তারা হীরার আন্তর্জাতিক সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করে একে দুর্লভ করে রেখেছে । আপনি জানেন যে, হীরা বহুমুখী খাতে ব্যবহার করা হয় কিন্তু সোনা যদি ১০০ খাতে ব্যবহার করা হয় তাহলে হীরা ১৫-২০ খাতে ব্যবহার করা হয় ।
আপনি ভাবতে পারেন প্রাচীনকাল থেকেই সোনা-রুপায় লেনদেন হয় কিন্তু হীরা দিয়ে কেন লেনদেন হয় না ?
কারণ, হীরা সোনার মত নরম না । এটা কঠিন ও শক্ত পদার্থ । হীরার কাটিং, রঙ, স্বচ্ছতা, ক্যারেট প্রতিটা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে । আপনি দোকানে গিয়ে গম কিনে যদি হীরা দেন তাহলে দোকানদার বলবে, এই হীরার রঙ ঠিক নাই, কাটিংয়ে সমস্যা আছে । কিন্তু সোনা নরম এবং সহজেই একে নানান শেইপ দেয়া যায় এবং ক্যারেট আলাদা করা সহজ । সবচেয়ে বড় কথা হল, প্রতিদিন এর দাম নির্ধারিত হয় কিন্তু হীরার দাম আন্তর্জাতিক এককে নির্ধারিত হয় না । এর বিভিন্ন শেইপের উপর নির্ভর করে আলোচনার ভিত্তিতে দাম ঠিক করা হয় । অনেক সীমাবদ্ধতার কারণেই হীরাকে আন্তর্জাতিক রিজার্ভের জন্যও নির্ধারণ করা হয়নি ।
সহজভাবে বলা যায়, যে জিনিস সহজেই গলিয়ে নির্ধারিত আকার দেয়া যায় সেটা সবার কাছে গ্রহণীয় কিন্তু একটা কঠিন পদার্থকে যদি কাটছাট করে একটা নির্ধারিত সাইজে আনতে চাওয়া হয় তাহলে প্রচুর ধাতু নষ্ট হবে ।
উপরের আলোচনা থেকে আপনি জানতে পারলেন হীরা কেন সোনার থেকে পিছিয়ে গেছে । এবার কথা হল, আপনি কেন হীরা কিনবেন না ?
সোনার মত স্ট্যান্ডার্ড না । কাটিং, রঙ, সাইজ, সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর এখানে । তারপর এটা রিসেল করতে গেলে অনেক কিছু বাদ চলে যায় । যেমন, ডিজাইন, ব্র্যান্ড ভ্যালু, মজুরি, ভ্যাট, ইত্যাদি বাদ যায় । তখন শুধু ধাতুর দাম আপনাকে দেয়া হবে । তাছাড়া আর্থিক ব্যাপারটাও এখানে জড়িত, যেহেতু এটা অনেক মুল্যবান তাই সেকেন্ড হ্যান্ড হীরা কিনে কেউ ভয়ে থাকতে চায় না, এটা আসল তো ? সোনা যেমন প্রায় সব দোকানে টেস্ট করা যায় কিন্তু হীরা নির্ধারিত ল্যাব বাদে কোথাও সেভাবে টেস্ট করে না । কেবল সনদ দিয়ে এটা চালানো হয় । এবং এই সনদ দেয়া হয় ৪C এর উপর ভিত্তিতে । এগুলি হলো, Clarity, Cut, Carat, Color । এই সনদের টেস্ট করতেও আন্তর্জাতিক বাজারে ছোট ক্যারেটের জন্য ৫০ ডলার, বড় ক্যারেটের জন্য ১০০ ডলারের বেশী খরচ হয় । গুলশানে হীরা টেস্টিং একটা ল্যাব আছে । অন্যদিকে সোনা টেস্ট করতে ৫০-১০০০ টাকা নিতে পারে দোকান ও টেস্টভেদে ।
আশা করি, সেকেন্ড-হ্যান্ড হীরা কেনা কত ঝামেলার সেটা বুঝেছেন । তাছাড়া গোল্ডের যেমন ৮-২০% বাদ দেয়া হয় ক্যারেট ও দোকানভেদে, হীরার ক্ষেত্রে এটাও অস্বাভাবিক খারাপ অবস্থা । মাত্র ২০-৬০% দাম আপনাকে দেয়া হবে হীরার ক্ষেত্রে ।
তাই বলা যায়, সোনা হল সত্যিকারের একটা এসেট, যা ক্রয় বা বিক্রয় অত্যন্ত সহজ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটা ধাতু যার গ্রহণযোগ্যতা ও কাজের পরিধি প্রায় সব শিল্পেই রয়েছে । কিন্তু হীরার রিসেল সিস্টেম অত্যন্ত জটিল, কাস্টমার খুঁজে পাওয়া যায় না, খুব কম কাজে এটা ব্যবহার করা হয়, এর আন্তর্জাতিক মাপকাঠি নেই ।
আরেকটা বিষয় হল, হীরা মাপা হয় ক্যারেটে । সোনার মত গ্রাম বা ক্যারেট নির্ধারণ নেই । এখানে সোনার বিশুদ্ধ মাত্রা হল ২৪ ক্যারেট কিন্তু হীরার বিশুদ্ধতা মাপা হয় কেবল সনদ দিয়ে যা 4C - cut, color, clarity, carat মিলিয়ে দাম ঠিক হয় ।
সোনা যেমন ১ গ্রাম পাওয়া যায়, হীরার এক ক্যারেট হল ০.২ গ্রাম । মানে ১ গ্রাম হীরা হল ৫ ক্যারেট ।
মধ্যমমানের হীরা ভালো কাটে কিন্তু রঙ ও স্বচ্ছতা না থাকলে প্রতি ক্যারেট ৯০ হাজার থেকে কয়েক লাখ হতে পারে । আবার, ৩.২০ ক্যারেটের লুজ হীরার দাম সাড়ে ছয় লাখ টাকার বেশী হয় । কিন্তু উপরে যেসব সনদের কথা বলেছি সেগুলি সহ জিআইএ, ডি গ্রেড, রঙ, ভালো কাট, স্বচ্ছতা যদি পেতে চান তাহলে কয়েক কোটি টাকা খরচ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে ।
আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, ১৯ শতকে ডি বিয়ারস কোম্পানি প্রচারনা চালিয়ে একে অন্য লেভেলে নিয়ে গেছে । তারা A Diamond is Forever ক্যাম্পেইন চালিয়ে হীরাকে কেবল বিয়ের প্রতীক বানিয়ে ফেলেছে । তাই মানুষের মগজে ঢুকে গেছে হীরা কেবল বিয়ের আইটেম ।
তাই, সোনা হল সত্যিকারের একটা এসেট কিন্তু হীরা হল লাক্সারি ।
আপনি হয়ত ভাবছেন সবই ঠিক আছে কিন্তু কোহিনুর বা আমাদের দেশে থাকা দরিয়া ই নুর হীরার দাম কমে না কেন ? এর ভ্যালু এতো বেশী কেন ?
কারণ এর সাথে ইতিহাস এবং সম্মান জড়িত । মুঘল, পারস্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস এর সাথে জড়িত । এটা কেবল আর হীরা নেই । এটা রাজা বাদশাহদের প্রতীক হয়ে গেছে ।
সাধারণ হীরার সাথে কেবল দাম ও চার সি সনদ জড়িত ।
কিন্তু এর সাথে দাম, ইতিহাস, লেজেন্ড, স্ট্যাটাস যুক্ত হয়ে গেছে । কোহিনুর ১০৫ ক্যারেটের কিছু বেশী বা ২১ গ্রামের কিছু বেশী ওজন । এক্সপার্টস মতামত হলো, কোহিনুরের দাম ১-২ হাজার কোটি টাকা হতে পারে । আসলে এরকম দুস্প্রাপ্য একটা আইটেমকে দামের ভেতর ফেলা যায় না । আর যেহেতু কোনদিন এই হীরার দামাদামি হয়নি তাই এক্সপার্টস মতামতও বাতিল করে দেয়া যায় ।
তাই আপনি যদি শখ করে ব্যবহার করতে চান তাহলে হীরা কিনতে পারেন কিন্তু বিনিয়োগের মাধ্যম চিন্তা করলেই এটা হবে নিরেট বোকামি ।
অনেকের প্লাটিনাম ইনভেস্ট ভাবনা থাকতে পারে। আজ্ঞে না, এটাও করা যাবে না । বিনিয়োগ স্ট্যান্ডার্ড হল শুধুই সোনা বা গোল্ড । যদিও প্লাটিনাম সোনার মত স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে, বিশ্ববাজারে দামও কম কিন্তু এটা সত্যিকারের দুস্প্রাপ্য ধাতু ও হীরার মতই এর ব্যবহার ক্ষেত্র কম । আর সোনার মতই ১০-১৫% কেটে নেয়া হয় ।
যেহেতু আমাদের ব্যাংকিং চ্যানেল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে এবং পরের সরকারগুলির প্রতিও আস্থা কম তাই গোল্ডে বিনিয়োগ নিরাপদ ও হালাল । আর হালালেই বরকত থাকে 

কোন মন্তব্য নেই